বিশ্ব সংকটের অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত

সুমিত ঘোষ 

সারা বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তার সাথে ভারতবর্ষেরও একটা সংযোগ রয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে, এমনকি পরিবেশ প্রকৃতির ক্ষেত্রেও তার নঞর্থক প্রভাব ফেলবে। এই সংকট সম্পর্কিত আলোচনা বহু বছর ধরেই হচ্ছে, ২০০৮ সাল বা তার পর থেকে বেশি বেশি করে হচ্ছে। কিন্তু ২০০৮-এর সময়ে আমাদের দেশে ওই সংকটের প্রভাব খুবই কম পড়েছিল। ২০১৬-র চীনা সংকটের পর থেকে এই বিষয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে। এই বছর ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে অপহরণ করা হল কিংবা ইউএস-ইরান যুদ্ধ শুরু হল, তখন থেকে এই সংকট বিষয়ক আলোচনা আরও প্রসারিত হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বললেন যে শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, তিনি যখন খুশি কলম্বিয়ার পেদ্রোর সরকারকেও ফেলে দেবেন, কারণ পেদ্রো তার কথা শুনছে না। তারপর বললেন যে তিনি গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চান। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বুঝেছে যে তাদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে, কিছু একটা এবার তাদের করতে হবে। এবার তাদেরকে সম্মুখ সমরে মাঠে নামতে হবে। জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্স, ডেনমার্ক ইত্যাদি, প্রত্যেকে এটা প্রচার করল যে তারা সেনা পাঠাচ্ছে গ্রিনল্যান্ডে। কারণ গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। আইনত গ্রিনল্যান্ড হচ্ছে ড্যানিশ রাজমুকুটের অধীনে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সে ডেনমার্কের অধীনে নয় এবং ডেনমার্কের থেকে তার যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে। তাছাড়া ডেনমার্কের অর্থনৈতিক পরিসর অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের কাছাকাছি মোটেও নয়। আর প্রত্যেকে যে সেনাপ্রতিনিধি পাঠাচ্ছে বলেছিল, আসলে তারা একজন, দুজন, তিনজন করে পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে মাত্র! অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ডের উপর আক্রমণ হলে তা আটকানোর জন্য ফৌজ পাঠানো হয়নি। পুরোটাই প্রতীকী। ভারতের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। মার্কিনীরা যখন ডাল বিক্রি করতে আসে, তখন ভারত সরকার বলে যে ট্যারিফ যুদ্ধ চালানো হলে তারাও মার্কিন ডালের ওপর ৩০% ট্যারিফ চাপাবে। আমাদের দেশ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা অনেক দ্রব্যের উপরেই এরকম কর চাপায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর এই কর চাপানোটা অনেকটা প্রতীকী কারণ এই আমদানি করা ডালের পরিমাণ খুবই কম আর সেই ডালের ওপর যদি কিছু কর চাপানো হয় তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এসে যায় না। আমাদের দেশ হয়তো এটা দেখাতে চাইছিল যে আমাদের সাথে ঝামেলা করলে পাল্টা ঝামেলা করা হবে। কিন্তু এই ঘটনার ঠিক উল্টোদিকে ইন্ডো-ইউএস ট্রেড ডিল সম্পন্ন হল যেখানে মার্কিন কৃষিপণ্য ভারতের বাজারে ঢুকিয়ে দেওয়ার অবাধ পরিস্থিতি তৈরি করা হল। অর্থাৎ ইপ্সটিন ফাইলস জনসমক্ষে চলে আসার প্রেক্ষাপটে মার্কিন আগ্রাসনের কাছে মোদী সরকার মাথা নত করল। এই প্রবণতা বজায় রইল ইউএস-ইরান যুদ্ধের সময়েও। বিজেপি সরকার কোনও নির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে কার্যত ইউএস-এর সুবিধা করে দিয়ে হরমুজ প্রণালীতে দেশের প্রয়োজনীয় গ্যাসবাহী জাহাজদের বিপদে ফেলল। 

এবারের ২০২৬-এর কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারত সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা নিজেদের মত করে এআই ডেভেলপ করার চেষ্টা করছে যেটা তৈরির জন্যে মার্কিন বা চীন কোনো অক্ষেরই সাহায্য নেওয়া হবে না। কিন্তু তারপরেই আসে গালগোটিয়া ইউনিভার্সিটির ঘটনা। চীনা রোবট কুকুরকে ভারতীয় হিসেবে দেখিয়ে ভুঁইফোঁড় ঘোষণাগুলোকে মহিমান্বিত করা হয় এই বলে – ইয়োর সিক্স ক্যান বি মাই নাইন। এর বাইরে এবারের বাজেটে নতুন কিছু নেই। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বলেছে যে চাকরিবাকরি দেবে না, কাজকর্ম দেওয়া সরকারের দায়দায়িত্ব না, নিজেরা করেকম্মে খাও। নিজেরা ব্যবসা করো, তার জন্য টাকা পয়সা দেওয়া হবে কিন্তু এর বাইরে যেটা নতুন ঘোষণা - রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট নিষ্কাশন। তার জন্য ওড়িশা, কেরালাম এবং আরও কিছু রাজ্যের কথা বলা হয়েছে। কারণ ওই মৌলগুলো এআই-এর সাথে সম্পর্কিত। এই হল সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পরিস্থিতি।  

আলোচ্য অর্থনৈতিক সংকটের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোকে বুঝতে গেলে আমাদের আগে মার্ক্সীয় অর্থনীতির কয়েকটা কথাতেই ফিরে যেতে হবে। মানব সভ্যতার আদি সমাজ ব্যবস্থাতে জিনিসের বিনিময় হত। কিন্তু বিনিময়ের ক্ষেত্রে সমান পরিমাণ হতে হবে - তার পরিমাপ হচ্ছে ওই দুটো জিনিস তৈরি করতে কতটা খাটুনি লেগেছে। তা মাপবো কিভাবে? শ্রম সময় - কতক্ষণ খাটছি। তার মানে এখানে একটা তুল্যমূল্যের জায়গা রয়েছে, সমানে সমানে বিনিময় হচ্ছে। এরপর যে সমাজ এল, তা হল পণ্য-মুদ্রা-পণ্য। পৃথিবীর অন্যান্য মানব সভ্যতায় মুদ্রা অনেক দেরী করে এসেছে, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই মুদ্রার প্রচলন ছিল। পুঁজিবাদে যখন আমরা উত্তীর্ণ হলাম, সমগ্র প্রক্রিয়াটা হয়ে দাঁড়াল অর্থ-পণ্য-আরও অর্থ। অর্থাৎ অর্থ বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদিত হল আর সেটাকে বিক্রি করা হল যে দামে তা শুরুর খরচের চেয়ে বেশি। ফলে বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইনপুট, যা খরচ করেছি শুরুর দিকে, আর আউটপুট, অর্থাৎ যে মানে বিক্রি করেছি সব শেষে, তা আর সমান রইল না। এই অসমানতাই হচ্ছে পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই সমগ্র বিশ্বে শ্রমিকদেরকে যা মজুরি দেওয়া হয় আর তারা যা পণ্য উৎপাদন করে, সামগ্রিকভাবে তাদের দাম ঐ মজুরির থেকে বেশি। তার মানে সারা বিশ্বের মানুষ সমগ্র পণ্য কিনে উঠতে পারবে না, কিছুটা রয়ে যাবে। পুঁজিবাদের এই বৈশিষ্ট্যকে মার্ক্স বলছেন অতি উৎপাদনের মহামারি। এই মহামারি থেকে বাঁচতে বিভিন্ন পথে পুঁজিবাদ বিকশিত হয়েছে; তার শুরুর দিকে যা চরিত্র ছিল স্বাভাবিকভাবেই তা পাল্টাতে পাল্টাতে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তার চরিত্র আমূল পাল্টে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিপতিরা বুঝতে পারল যে একটা শক্তিশালী বিরোধী অক্ষ তৈরি হয়ে গেছে - সোভিয়েত ইউনিয়ন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ইত্যাদি দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে গেছে, তাই তাদেরকে নিজের দেশের লোকজনকেও কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যাতে তাদের ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে। এটাও তারা বুঝল যে ঐ অতিউৎপাদনের মহামারি থেকে আসন্ন সংকটের আগমনকে বিলম্বিত করতে হবে। আনা হল কেন্সীয় মডেল, যার প্রধান চরিত্র হচ্ছে কম দামী টেকসই পণ্য বিরাট পরিমাণে তৈরি করা এবং তা বেচার জন্য বহু সংখ্যক লোককে কম মজুরির কাজ দেওয়া। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বহু সংখ্যক লোককে মজুরি দেওয়ার একটা দায়বদ্ধতা এসে পড়ল। কিন্তু ইনপুট-আউটপুট-এর সমস্যা তো রয়েই গেল। ফলে ২৫-৩০ বছর পরে আবার বিপদ এলো। ক্রাইসিস। তখন ইউএস থেকে রোনাল্ড রেগান কিছু বক্তব্য রাখতে শুরু করলেন, ইংল্যান্ডে মার্গারেট থ্যাচারের উত্থান হল এবং চীনে ডেং শিয়াওপিং উঠে এলেন। তারা একসাথে বললেন, ‘There is no alternative’ বা TINA অর্থাৎ একটা নয়া সমাজ ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। এটাকে তারা পপুলার ক্যাপিটালিজম নাম দিলেন। আজ আমরা এই ব্যবস্থাকে নয়াউদারবাদ বলি। আমরা এখনো এই দশাতেই রয়েছি। তবে হয়তো আমরা এই দশা থেকে এগোতে শুরু করেছি নতুন ধরণের পুঁজিবাদের দিকে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। ফয়সালা তো মারামারি না করলে হয় না আর মারামারির বহু রূপ আছে। আমরা ভেনেজুয়েলার সাথে ইউএস-এর ঝামেলার ক্ষেত্রে দেখেছি যে বিশাল রক্তপাত হয়েছে, এমনটা নয়। প্রথমে তারা ইন্টারনেট হ্যাক করেছে, কম্পিউটার স্তব্ধ করে দিয়েছে, দূর থেকে সিগন্যাল পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে দিয়েছে আর তারপর রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে অপহরণ করতে এসে সাউন্ড ভাইব্রেশন পাঠিয়ে কিউবান দেহরক্ষীদের অচৈতন্য করে দিয়েছে। এটাই ডিজিটাল কলোনাইজেশন। এর মানে আমার দেশের ইন্টারনেট, সফটওয়্যার, যা কিছু টেকনোলজি সংক্রান্ত জিনিস রয়েছে, সেগুলো যদি অন্য দেশের দ্বারা তৈরি হয়ে থাকে, আমি কার্যত তারই দাসে পরিণত হব। আরেকটা বড় উদাহরণ হচ্ছে নেপাল। নেপালে যে জেন-জি আন্দোলন হল, তা ডিসকর্ড বলে একটা মার্কিন অ্যাপ-এ প্রতিবাদীদের আলোচনার মাধ্যমে শুরু হয়। আর ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে আমাদেরও সমস্ত সফটওয়্যার ইউএসএ-র, ফলে আমাদের কেন্দ্র সরকার যাই করুক আর যাই বলুক না কেন, দিনের শেষে গিয়ে ঐ ইন্ডো-ইউএস চুক্তিতেই তাদের সই করতে হচ্ছে।

পুঁজিপতিরা চায় যন্ত্রপাতিতে টাকা বেশি খরচ করতে আর শ্রমিককে মজুরি দিতে তার গাত্রদাহ হয়। শ্রম নিবিড় শিল্প বেশি শ্রমিক নিযুক্ত করে বলে বেশি মূল্য উৎপন্ন করে। আর পুঁজি নিবিড় শিল্পে পুঁজিপতি বেশি মেশিনে ইনভেস্ট করে বলে তার উৎপন্ন মূল্য কম। নিজেদের এই সমস্যা মেটাতে পুঁজিপতিরা দাদাগিরি করে এই ফয়সালায় আসে যে 'যার যত ইনভেস্টমেন্ট তার তত প্রফিট' একটা লেবার ইনটেনসিভ ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে শ্রমিক বেশি, সেখানে যে পণ্য তৈরি হয়েছে তার ধরা যাক মূল্য হচ্ছে ১২০ টাকা আর যেখানে মেশিনে বেশি ইনভেস্ট হয়েছে, সেই ফ্যাক্টরিতে মূল্য উৎপন্ন হচ্ছে ধরা যাক ১১০ টাকা। যদি শুরুতেই ধরে নিই যে দুই পুঁজিপতি ১০০ টাকা খরচ করেছে, তাহলে দুজনেরই প্রফিট একই হওয়ার কথা। এই ফয়সালার ফলে দুজনেরই প্রফিটটা হয়ে গেল সমান - ১১৫ টাকা। ১২০ কমে ১১৫ হল আর ১১০ বেড়ে ১১৫ হল। তার মানে শ্রম নিবিড় শিল্পে উৎপন্ন মূল্য শোষণ হয়ে চলে গেল পুঁজি নিবিড় ফ্যাক্টরিতে। মূল্য রূপান্তরিত হল দামে। 'ভ্যালু টু প্রাইস ট্রান্সফরমেশন'। অর্থাৎ একজন পুঁজিপতি তার নিজের ফ্যাক্টরির লোককেই শোষণ করে না, পুঁজি নিবিড় শিল্প শ্রম নিবিড় শিল্পের শোষণ করে, সারা বিশ্বে সমগ্র পুঁজিপতি শ্রেণী সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণ করে এবং ছোট মুদ্রা অঞ্চল থেকে বড় মুদ্রা অঞ্চলেও শ্রম লুট হয়। বড় সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছোট সাম্রাজ্যবাদী দেশকে লুট করে, ছোট সাম্রাজ্যবাদী দেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশকে লুট করে - ফলে মার্ক্সের এই লুটের তত্ত্ব আম্বেদকরের কাস্ট সম্পর্কিত উক্তি ‘গ্রেডেড ইনইকুয়ালিটি’-র সাথে মিলে যায়: একজন ব্যক্তি নিজে নিপীড়িত কিন্তু সে আবার তার থেকে সামাজিক সিঁড়িতে নীচে থাকা আরেকজনকে নিপীড়ন করে। এই কারণে লেনিন বলছেন যে সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের একাংশ আর্থিক কৌলিন্যে ভোগে - তারা ভালোভাবে জানে যে পৃথিবীর আরেকাংশে শোষণ চলছে বলেই তাদের মজুরি বেড়ে রয়েছে। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক সংকট আসে, তা মানুষকে লড়াইয়ের মানসিকতায় উত্তীর্ণ করে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমরা দেখছি যে বামপন্থী চেতনায় মানুষজন রাস্তায় নামছে, মার খাচ্ছে, তারপর আবার আন্দোলন হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ইউরোপ জুড়ে একই ছবি - ফ্রান্সের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস একটা নতুন পর্যায়ে চলে গেছে আর গ্রিসে সমানে আন্দোলন চলছে।

এবার যদি নয়াউদারবাদের কথা ধরি - মোটের ওপর সে চাকরিবাকরি দেবে না, সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরা করে নাও, সরকার সবকিছু থেকে হাত তুলে নিচ্ছে। কেন্সীয় মডেল চলাকালীন কম দামী বেশি মাত্রায় টেকসই পণ্য তৈরি হলেও পুঁজিবাদের বেসিক ইনপুট - আউটপুটের সমস্যা রয়েই যায়ফলে নয়াউদারবাদের স্তরে এসে বেশি দামী ঠুনকো পণ্য কম সংখ্যায় বারংবার তৈরি করা শুরু হল বেশি দামী পণ্য তৈরি করলে এমন মানুষ সমাজে রাখতে হবে যে সেই পণ্য কিনে উঠতে পারবে। তাই নয়াউদারবাদী মডেলের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠল বহু সংখ্যক লোককে কম মজুরির কাজ দেওয়ার বদলে কম সংখ্যক লোককে বেশি মাইনে দেওয়া এই কম সংখ্যক লোকই হবে নয়াউদারবাদী পণ্যের ক্রেতা তাই সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে সেভেন্থ পে কমিশন লাগু হল। তাদের মাইনে এত বাড়িয়ে দেওয়া হল যে তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তাই পার্মানেন্ট কর্মচারী ৯০ হাজার টাকা মাইনে পাচ্ছে আর সংখ্যায় বেশি কন্ট্রাকচুয়াল কর্মীরা একই কাজ করে মাসে ৩০ হাজার টাকাও পাচ্ছে নাঅর্থাৎ পুরোটাকে আউটসোর্স করে দাও, সবাইকে ভালো মাইনে দেওয়ার কোনো দরকার নেই, কিছু জনকে দেব, তারা পণ্য বারবার কিনতে পারবে, পণ্য ঠুনকো তাই কিছুদিন পরেই খারাপ হয়ে গেলে আবার কিনতে হবে। এটা করে পুঁজিপতিরা ভাবলো যে বেশি পরিমাণে তৈরি করলে পণ্য যখন বিক্রি হচ্ছে না, তখন কম পরিমাণে বারংবার তৈরি করলে হয়তো সব বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু আদতে আমি যাই করি না কেন, ইনপুট আউটপুটের সমস্যা তো মিটবে না। আমাদের দেশে ১৯৯১-তে আসা এই নতুন নয়াউদারবাদী ব্যবস্থা আজ ২৫-৩০ বছর পরে গিয়ে তাই সমস্যায় পড়ছে

এবার আসা যাক শেয়ার মার্কেটেমার্ক্স শেয়ার মার্কেটের উদ্ভব সম্পর্কে অনেক কিছু প্রেডিক্ট করে গেছেন। আমরা ক্যাপিটালের থার্ড ভলিউমের ২৫ ২৭ নম্বর চ্যাপ্টারে দেখতে পাব যে তিনি স্টকের কথা, ফিকটিশাস ক্যাপিটালের কথা বলে গেছেন। আজকের দিনে প্রশ্ন হল, আমি ১০ টাকা ইনভেস্ট করে ১০০ টাকা পেয়ে যাব অর্থাৎ টাকা দিয়েই যদি টাকা বাড়ানো যায়, তাহলে শ্রমিকের আর দরকার কি? ইকোনমিক গ্রোথ তো জবলেস গ্রোথ কিন্তু তা নয়, এখানেও মার্ক্সবাদ রয়েছে, তা চোখে দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের চেতনার উন্নতি হলে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠেফাটকা বাজারে যে কান্ডকারখানা চলে তাতে যতবার একটা জিনিসের হাতবদল হয়, তত তার মূল্য বাড়তে বাড়তে যায়। ধরা যাক, আমরা ৮ জন পরস্পরের থেকে ১০০ টাকা পাই। আমি ১০০ টাকা রোজগার করে আরেকজনকে দিয়েছিউনি তাহলে আমার থেকে ১০০ টাকা পেয়ে গেলেন আর আমার ধার শোধ হয়ে গেল উনিও ওই ১০০ টাকা অন্যজনকে দিলেন ওনার ধার শোধ হয়ে গেল এভাবে ওই ১০০ টাকা ঘুরতে ঘুরতে আবার আমার কাছেই ফেরত এলো সবার ধার শোধ হল। তাহলে কত টাকা ঘুরল? ১০০। ব্যালেন্স শিটে কিন্তু ১০০+১০০+১০০+১০০+১০০+১০০ ১০০+১০০=৮০০-র কাছাকাছি চলে গেছে। কিন্তু সত্যিকারের তো ১০০ টাকাই আছে! এভাবেই ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির গল্প তৈরি হয় আরেকটা উদাহরণ, আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১০ টাকা আছে। ব্যাঙ্ক ঐ টাকাটা ইনভেস্ট করেছে কোথাও গিয়ে কিন্তু আমার অ্যাকাউন্টে ১০ টাকা লেখা আছে যাকে ব্যাঙ্ক দিয়েছে, তার কাছেও এখন ১০ টাকা আছেঅর্থাৎ হাতবদলের মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ টাকার ফানুশ তৈরি হলএবার যাকে ব্যাঙ্ক টাকা দিয়েছে, সে যদি শ্রমিক দিয়ে পণ্য উৎপাদন করিয়ে তা বিক্রি করে ওর ইন্টারেস্ট ফেরত দিয়ে দিতে পারে, তাহলে আমি আমার ১০ টাকাটা ফিরে পাবঅর্থাৎ ফানুশ চুপসে ১০ টাকায় ফেরত আসবে আর তা না হলে এবং ডিফল্টারের সংখ্যা প্রচন্ড বেশি হয়ে গেলে ব্যাঙ্ক নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেবে আর ওই ফানুশ ফেটে যাবে তাই টাকা দিয়ে টাকা বাড়ানোর মাঝে শ্রমিক-উৎপাদন-বিক্রয়-এর চক্র রয়েছে। তা ঠিকঠাকভাবে কার্যকর না হলেই ফানুশ ফেটে যাবে।  

পুঁজিবাদ সব পণ্য বিক্রি করে উঠতে পারে না, তাই সে অন্যভাবে তা বিক্রি করার সুযোগ খোঁজে স্টক মার্কেটে। আমি জানি টাটা নুন তৈরি করে, তাই আমি টাকা লাগিয়েছি ওই জিনিসের ওপর - এটা এক ধরণের ট্রেডিং আরেক ধরণের ট্রেডিং আছে যেখানে আমি জিনিসটাকে চোখেই দেখিনি, তা এখনও উৎপাদিতই হয়নি, কিন্তু তার উপর টাকা লাগিয়েছিসেই ভবিষ্যতে উৎপাদিত হতে চলা জিনিসটার মালিকানা বারংবার হাতবদল হয়ে একটা ফানুশ তৈরি করে। ওই জিনিসটা তো বানিয়ে বিক্রি করতে হবে, নইলে ফানুশটা ফেটে যাবে - এটাই হচ্ছে ভবিষ্যৎ নির্ভর ফাটকা কারবার। 

Source: World Bank

জিডিপির শতাংশের নিরিখে স্টক ট্রেড করার গ্রাফে সত্যিকারের অর্থনীতি কত পারসেন্ট পর্যন্ত থাকে? ১০০% বা তার কম। ১০০% ক্রস হয়ে গেলেই অর্থনীতি অসত্য ১০০%-এর তলায় তা ফেরত চলে এলে আবার সত্য। দেশভিত্তিক গ্রাফের প্রবণতায় দেখে বোঝা যাচ্ছে যে অর্থনীতি সত্য থেকে অসত্যে গিয়ে আবার সত্যে ফিরে আসছে। এটা প্রবণতা হলেও অসত্য থেকে যদি সত্যে অর্থনীতি না ফেরে? লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ওঠানামার এই খেলায় গ্রাফের চূড়াগুলোর উচ্চতা বাড়ছে। অর্থাৎ ফানুশের বহর বাড়ছে। তারপর ক্রাইসিসের কারণে যখন পড়ে যাচ্ছে বা ক্র্যাশ হচ্ছে, অর্থাৎ ফানুশ যখন ফেটে যাচ্ছে, তখন অর্থনীতি সত্যে ফিরে আসছে ঠিকই কিন্তু ট্রাফের উচ্চতাও বাড়ছে, অর্থাৎ অর্থনীতি ১০০%-এর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু যদি এই ট্রাফ ১০০%-কে না ছুঁয়ে তার উপরেই অবস্থান করে? এমন সংকট দেখা দেবে যা সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পরিস্থিতি তৈরি করবে এবং তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের একমাত্র উপায় হয়ে উঠবে ফ্যাসিবাদ। গ্রাফ অনুযায়ী ভারতের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা ২০২৪ সাল অবধি সরাসরি দেখা না গেলেও ওয়ারেন বাফেটের ইন্ডিকেটার অনুমান করছে যে ২০২৫ পরবর্তীতে ট্রাফ আর ১০০% অবধি নামছে না! আর বিশ্ব অর্থনীতিতেও সামগ্রিকভাবে এমনই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে!

শেয়ারে আর্নিং কিভাবে হয়? স্টকে টাকা লাগাতে হবে। স্টক কেনার জন্য শুরুতে বেটিং হবে। বেটিং করতে করতে সবাই মিলে একসময়ে ঐক্যমত্যে আসবে যে স্টক প্রতি কত টাকা তারা দেবে। P/E (Price-to-Earnings) Ratio হল একটি কোম্পানির বাজারমূল্য তার বার্ষিক মুনাফার কত গুণ মূল্যায়িত হচ্ছে তার পরিমাপ। ধরা যাক, একটি এআই কোম্পানির বার্ষিক মুনাফা $ ১ বিলিয়ন এবং বাজার সেটিকে স্বাভাবিক প্রযুক্তিখাতের P/E = ২৫ অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে। তাহলে কোম্পানির বাজারমূল্য হবে ২৫ × ১ = $ ২৫ বিলিয়ন। এক বছর পরে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসায়িক কর্মদক্ষতা ২০% উন্নত হয়ে মুনাফা যদি $ ১.২ বিলিয়নে পৌঁছায় এবং বাজার তখনও যৌক্তিকভাবে P/E = ২৫ বজায় রাখে, তাহলে নতুন বাজারমূল্য হওয়ার কথা ২৫ × ১.২ = $ ৩০ বিলিয়ন, অর্থাৎ ২০% বৃদ্ধি। কিন্তু এআই নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস-এর কারণে যদি বিনিয়োগকারীরা বেটিং বারিয়ে P/E বাড়িয়ে ৮০ করে দেয়, তাহলে বাজারমূল্য দাঁড়াবে ৮০ × ১.২ = $ ৯৬ বিলিয়ন। ফলে মুনাফা বেড়েছে মাত্র ২০%, কিন্তু বাজারমূল্য বেড়েছে $ ২৫ বিলিয়ন থেকে $ ৯৬ বিলিয়নে, অর্থাৎ প্রায় ২৮৪%! এর মধ্যে প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে অন্যায্য মূল্য হল $ ৬৬ বিলিয়ন (৯৬ − ৩০)। এটাই হল ফানুশ বা অতিমূল্যায়নের অংশ। সাধারণ প্রযুক্তি খাতে যুক্তিসঙ্গত P/E সাধারণত ২০–৩০-এর মধ্যে থাকে, কিন্তু ২০২৪ সালে অনেক এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির P/E প্রায় ৫০–৭০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। উদাহরণস্বরূপ, এআই সংশ্লিষ্ট ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানি প্যালান্টির-এর P/E অনুপাত একসময় প্রায় ৪০০ গুণ বৃদ্ধি পায়! 

রিসেশনের দিকে এক পা এক পা করে বিশ্ব এগোচ্ছে, কারণ অর্থনীতি অসত্য হয়ে আছে, সত্যে নেমে আসছে না। এই ক্রাইসিস ঘনীভূত হলে সবাই ভয় পেয়ে টাকা তুলে নেবে মার্কেট থেকে। তখনই কর্মহীনতা, বিপুল সংখ্যক লোকের চাকরি হারানো, নেগেটিভ ইকোনমিক গ্রোথ দেখা দেবে।

মার্কেট বুম ও ক্র্যাশের চক্রে ১৯৯০ সালে জাপান এফেক্টেড হল (অ্যাসেট বাবেল কোল্যাপ্স) জাপান আগামী ১০ বছরে এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না। ১০ বছর ধরে চলা বেহাল অর্থনীতির এই সময়কালকে বলা হয় লস্ট ডিকেড২০০০ সালে এল ডট কম ক্রাইসিস হঠাৎ পুঁজিপতিরা মনে করল যদি কম্পিউটারে টাকা লাগানো হয় তাহলে রাতারাতি প্রচুর টাকা প্রফিট করা যাবেকম্পিউটারের মাধ্যমে কাজকর্মে উন্নতি হয়েছে কিন্তু ২৫ বছর সময় লেগেছে। কিন্তু ওই সময়ে এত টাকা লাগিয়ে ফেলা হয়েছিল যে রাতারাতি কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন আসছিল না। এই পরিস্থিতির কারণেই মার্কেট ক্র্যাশ হল। এরপর ২০০৮-এ গিয়ে এলো সাবপ্রাইম ক্রাইসিস ২০০৮-এ চীন, ইউএসএ ও ইউরোপীয় কিছু দেশ এফেক্টেড হল। এরপর ২০১৫ সালে চীন এফেক্টেড হল। ২০২২ সালে ইউএস এফেক্টেড হল - এভ্রিথিং বাবেল কোল্যাপ্স।

২০০৮ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে সংকট দীর্ঘকালীন হতে চলেছে এর ফলেই সারা বিশ্বে ফ্যাসিস্ট প্রবণতাসম্পন্ন গভর্মেন্টগুলো চলে আসতে শুরু করল। ভারতে ২০১২ সাল থেকে সমস্ত দুর্নীতির মামলা শুরু হয়ে গেল, কংগ্রেস সরকার পড়ে গেল আর বিজেপি ক্ষমতায় চলে এলো ইউএসএ-তে ট্রাম্প দুবার এলোইতালিতে মুসোলিনির পরিবারের একজন এখন রাষ্ট্র নেতাজাপানে যিনি মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনিও উগ্রডানপন্থী। অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট প্রবণতাসম্পন্নদের উত্থান হচ্ছে কারণ অর্থনীতি অসত্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে

ইনফ্লেশন হলে কি করা হয়? ব্যাংক ইন্টারেস্ট রেট বাড়িয়ে দেয় যাতে লোকে ভয়ে আর টাকা ধার না নেয়। এর ফলে আস্তে আস্তে লেনদেন কম হবে, জিনিসপত্রের দাম কমে যাবে, ইনফ্লেশনও কমে যাবে। কিন্তু এই পথে ইনফ্লেশন কমে গেলে কেনাবেচার অভাবে ইকোনমিক গ্রোথও কমে যাবে। তখন গ্রোথ বাড়াতে হবে। তার জন্য ইন্টারেস্ট রেট কমিয়ে দেওয়া হবে। তখন আবার লোকে বেশি ধার নেবে কেনাবেচা করতে। এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, ইনফ্লেশনও বাড়বে। অর্থাৎ ইনফ্লেশন কমাতে গেলে গ্রোথ কমে যাবে, গ্রোথ বাড়াতে গেলে ইনফ্লেশন এসে যাবে।


Source: World Bank

জিডিপি ডিফ্লেটার দেশের আভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিকে দর্শায় উপরের গ্রাফ অনুযায়ী উল্লিখিত সমস্ত দেশের ক্ষেত্রে তা ঊর্ধ্বমুখীবিশেষ দ্রষ্টব্য ইউক্রেন। যুদ্ধ করে ওর অবস্থা খারাপইনফ্লেশান বোঝানোর আরেকটা পরিমাপ হল সিপিআই বা কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স। সিপিআই দেশের বাইরে থেকে আমদানীভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতিকে দর্শায় সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলির নিরিখে ইনফ্লেশান সংক্রান্ত গ্রাফগুলির বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে যুদ্ধ তারাই করছে যাদের ডোমেস্টিক ইনফ্লেশন কম। যার ডোমেস্টিক ইনফ্লেশন বেশি, সে আক্রান্ত হচ্ছেডোমেস্টিক ইনফ্লেশন ইউক্রেনের বেশি তাই ওকে আক্রমণ করা যায়। ডোমেস্টিক ইনফ্লেশন ইরানের বেশি তাই ওর বিরুদ্ধে ঝামেলা পাকানো যায়। যদিও ইরান ভালোই টাইট দিয়েছে মার্কিনীদের। 

এবার আসি আরেক প্রসঙ্গে। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল, তখন দেখা গেল ব্রিটিশ পাউন্ড বা স্টার্লিং-এর অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। বিশ্বে এরকম পরিবর্তন বারবার এসেছে। প্রথম ওয়ার্ল্ড কারেন্সি (সবাই যে কারেন্সিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেন করে) ছিল স্প্যানিশ ডলার, কারণ স্পেনেরই তখন সারা বিশ্বে আধিপত্য ছিল। পরবর্তীকালে ডাচ কারেন্সি তার স্থান নিলতারপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে ব্রিটিশ স্টার্লিং বা পাউন্ড ওয়ার্ল্ড কারেন্সি হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অবধারিতভাবেই তার জায়গা নিল ইউএস ডলার। ইউএস ডলার বিশ্ব কারেন্সি হয়ে যাওয়া মানেই ওটা রিজার্ভ কারেন্সিতে পরিণত হওয়াকেন? ইউএস সমস্ত তেলের খনির মালিকদের গিয়ে বলল তেল ডলারে বেচতে। অর্থাৎ কেউ তেল কিনতে চাইলে তাকে ডলারই দিতে হবে। কিন্তু তা পাওয়া যাবে কার থেকে? উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশকে ইউএস-কে বলতে হবে যে আমরা রুপি দিচ্ছি, তোমরা আমাদেরকে ডলার দাও। ইউএস তখন বলবে যে সে রুপি নিয়ে কী করবে? আমাদের মুদ্রায় আমাদের দেশের বাইরে কোথাও কোন জিনিস কি কেনা যায়? না। তাহলে সোনার সাথে টাকা ট্যাগ করতে হবে। কোনও দেশের কত মজুত সোনা রয়েছে তার ভিত্তিতে তার কারেন্সির মূল্য নির্ধারণ হবে। ইতিহাসে তা হতেই দেখা গেছে। এটাকেই বলা হয় ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট বা ব্রেটন উড সিস্টেম। তাহলে আমাদের সোনা কোথায় থাকবে? আমাদের দেশের মধ্যেই থাকবে বা অন্য দেশের ভল্টে রাখা হবে - সুইস ব্যাংকের ভল্ট, লন্ডনের ভল্ট, ইউএসএ-এর কোনও ভল্ট। যতটা সোনা রাখা আছে, তত পরিমাণ ডলার পাওয়া যাবে যা দিয়ে তেল কেনা হবে। অর্থাৎ রিজার্ভ কারেন্সি মানে কোনো আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে গেলে ওই মুদ্রা আমাকে জমাতে হবে। যেহেতু কোনো আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে গেলে ডলারই লাগবে, তাই আমাকে ডলারই জমাতে হবে। আর ডলার ইউএস-এর কারেন্সি - এই দেশটা পণ্য তৈরি করে না, শুধু পণ্য কেনে। ইউএসএ হচ্ছে বিশ্বের কনজিউমার। ও ডলার দান করে দিয়ে সবার থেকে জিনিসপত্র কেনে নিজে ব্যবহার করবে বলে।


Source: https://jamesbachini.com/nixon-shock/

১৯৭০-এর দশকে হঠাৎ ইউএস-এর মুদ্রাস্ফীতি এত বেড়ে যায় যে তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বলেন যে এই সোনাভিত্তিক লেনদেন করে ঝামেলা পেকেছে। একটা দেশের কতটা সোনার মজুত থাকবে তাতে তো লিমিট আছে। তাহলে কী করতে হবে? হঠাৎ একদিন নিক্সন বলেন, 'আজ থেকে সোনার সাথে ডলারের ডাইরেক্ট কোনো সম্পর্ক নেই'। অর্থাৎ তারা যত খুশি ডলার ছাপাবে আর বিলি করবে। এটাকেই বলা হয় ব্রেটন উড ব্যবস্থার পতন। সোনার সঙ্গে আর সম্পর্ক রইল না। তাহলে এখন প্রতিটা দেশের কারেন্সি কিসের ওপর নির্ভর করছে? বাজারের চাহিদার যোগানের ওপর। যখন ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট ছিল, কারেন্সির দাম বেশি ওঠানামা করত না। কিন্তু নিক্সনের নয়া ব্যবস্থায় বিশ্বের সমস্ত কারেন্সির মূল্য বাজারে ব্যাপক ওঠানামা করতে শুরু করল। এতে দিনের শেষে ইউএসএ-রই লাভ কারণ এক্সচেঞ্জ রেটে তার ভ্যালু সবসময় বেশি থাকবে অর্থাৎ সে কারেন্সি দিয়ে বিশ্বের ওপর আধিপত্য কায়েম রাখবে। তার মিলিটারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, সমস্ত ট্রানজ্যাকশান বিজনেস তার দেখানো সিস্টেমে চলছে, ফলে সে যা বলবে তাই হবে।  

যে টাকা লাগাব শেয়ার মার্কেটে, তা কোথা থেকে পাব? ধার করব। ইউএস-এর ধার কীভাবে বাড়ছে? আগামী কিছু বছরের মধ্যেই ওর ধার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কাছাকাছি চলে যাবে। এবার ইউএস ফেডারেল গভর্মেন্ট কী করবে বুঝতে পারছে না! একজন উন্মাদকে নির্বাচিত করিয়ে এনেছে। কিন্তু রুলিং ক্লাসের স্বার্থের নিরিখে সে একটাও বাজে কথা বলছে না; যদিও সে ইজরায়েলের কথায় নেচে যুদ্ধের পাগলামি করে নিজেরই গদি টলোমলো করিয়ে দিয়েছে। সে বলল, আমি তোকে জিনিস বেচলে তুই তার ওপর ট্যাক্স লাগাস, তাই তুই আমাকে জিনিস বেচতে এলে আমিও তোর ওপর ট্যাক্স লাগাব। ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু হল। কিন্তু তার কথা মানছে না সব দেশ। চীন পাল্টা ট্যারিফ চাপাচ্ছে। রাশিয়া ঝামেলা করছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঝামেলা করছে ইত্যাদি। 

শেয়ার মার্কেটে টাকা লাগাতে গেলে ধার নিতে হবে। ফলে ইউএসএ-র পুঁজিপতিরা ধার করেছে। এখন সেই ধার ট্রান্সফার করছে জনগণের ওপর। ওদের ধার সমগ্র ইউরোপ - আফ্রিকা - সাউথ আমেরিকার মীলিত জিডিপির থেকেও বেশি। এত বেশি ধার যে ওরা বুঝে গেছে যে সেই ধার শোধ করা যাবে না। ওদের প্রত্যেক বছর ৮ ট্রিলিয়ন ডলার শুধু সুদ দিতে হচ্ছে সারা বিশ্বকে। তার ফলে ওদের প্রত্যেক বছর ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ডেফিসিট হচ্ছে। তাই ট্রাম্প বুঝে গেছে যে ডলার তার আধিপত্য হারাচ্ছে।  

ইউএসএ ইনফ্লেশন নিজের কাছে রাখে না, বাইরে বিলি করে দেয়। ও নিজে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে অন্যজনের কাছে দান করে দেয়, ঠিক যেভাবে ছোট মুদ্রা অঞ্চলকে বড় মুদ্রা অঞ্চল শোষণ করে। খুব সহজভাবে বললে, ধরা যাক আমরা ইউএস-কে কোনো একটা জিনিস বেচলাম। তাহলে ও আমাকে কি দিল তার পরিবর্তে? ডলার। এই ডলার রিজার্ভ ব্যাংকে এলো। এবার ডলারের সমতুল্য টাকা বাজারে ঢুকে পড়বে (সরলীকৃত)। এবার বাজারে ১০০ টাকার পণ্য ঘুরছে আর এক্সট্রা যে টাকা ঢুকে গেছে, সেটা টোটাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ১১০ টাকা। বাজারে ১০০ টাকার পণ্য ঘুরছে আর টাকা ঘুরছে ১১০ টাকা। ১০ টাকা এক্সট্রা চলে এসেছে ওই বিদেশী লেনদেন করতে গিয়ে। এই অবস্থাকে দুইভাবে দেখা যায় - ১০০ টাকার জিনিসটার দাম ১১০ টাকা হয়ে গেছে। তার মানে জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। বা ১১০ টাকার মূল্য ১০০ টাকা হয়ে গেছে, অর্থাৎ টাকার দাম পড়ে গেছে। এই উভয়ই একই ঘটনা। একে বলে মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশন। তাহলে ইনফ্লেশনটা এলো কোথা থেকে? ওই ইউএস থেকে ডলার এলো বলেই না? ইউএস নিজের কাছে ডলার মজুত রাখে না, সবসময় জিনিস কিনছে আর ডলার বিলিয়ে যাচ্ছে। ডলার হচ্ছে অভিশাপ। ডলার সেই মুদ্রারাক্ষস - সে যার কাছে আসবে, তার সর্বনাশ হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ কেন হল? কেন হঠাৎ রাশিয়া মনে করল যে যুদ্ধ করবে? ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ার মুদ্রাস্ফীতি কমে গেল। ও সমস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোতে রাশিয়ান নৌ নৌসেনা পাঠিয়ে, রাস্তা আটকে বলল যে ওর সাথে লেনদেন করতে হলে ডলার চলবে না। রুবেলে লেনদেন করতে হবে। ওই সময়ে ভারতীয় সূচকও ৭ থেকে ৪-এ নেমে গেল কারণ তখন ভারত সরকার ইউএস-এর কথা না শুনে নেহরুপন্থী জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি অবলম্বন করে রাশিয়ার থেকে তেল কিনতে শুরু করেছিল। রুপি-রুবেল-এ লেনদেন শুরু হল - ডলারবিহীন লেনদেন।  

যখন ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ট্রাম্প পুতিনকে আক্রমণ না করার পরামর্শ দেয়, কিন্তু পুতিন জানিয়ে দেন যে তিনি সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। এরপর ইউএস রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (ফরেক্স রিজার্ভ) আটকে দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়। অনেক দেশ ডলার কিনে ইউএসএ-র কাছেই সংরক্ষণ করে রাখে, কারণ তারা ধরে নেয় যে প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু রাশিয়ার রিজার্ভ জব্দ হওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশও চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা ভাবতে শুরু করে যে যদি রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে কোনো দেশের রিজার্ভ আটকে দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে চীন, ইউরোপ, রাশিয়া এবং আরও অনেক দেশ ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা ভাবতে শুরু করে। অনেকে ডলারভিত্তিক সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে সোনায় বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে, যাতে তাদের সম্পদ কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে সোনার গুরুত্ব আবার বাড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ইউএস-ও বুঝতে পারে যে অতিরিক্ত আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করলে তার নিজেরও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হতে পারে। তখন ইউএস জ্বালানি ও তেলের বাজারে একাধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা চালায়। যদি কোনো দেশ মার্কিন নীতির সঙ্গে না চলে, তাহলে তেল সরবরাহ বা জ্বালানির বাজারকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

বিশ্বের সমস্ত তেল অধিগ্রহণ করাই ইউএস-এর স্বাভাবিক পলিসি। যে কোনো নতুন তেলের খনি বেরোলে ও বলবে ডলারে বেচতে। সাদ্দাম হোসেন যেই বলল, যে কোনো কারেন্সি দিয়ে ওদের তেল কিনতে পারা যাবে, অমনি কেমিক্যাল ওয়েপন থাকার দোহাই দিয়ে বোম ফেলা শুরু হল। গাদ্দাফিরও একই পরিণতি হল। ভেনেজুয়েলাকে আক্রমণ করা হল কেন? কারণ ভেনেজুয়েলা ডলারবিহীন লেনদেন মারফৎ রাশিয়াকে তেল দিচ্ছিল। পেট্রো ডলারের আধিপত্য যে চ্যালেঞ্জ করবে, ইউএস সেখানেই কিছু একটা অজুহাতে ঝামেলা পাকাতে যাবে। 

কেন ইউএস তেলের আধিপত্য নিয়ে চিন্তিত? তেলকে কেন্দ্র করে বিশ্বের সমস্ত লেনদেন যদি ওর ডলারে না হয় তাহলে ডলার তার বিশ্ব আধিপত্য কায়েম রাখতে পারবে না। বিভিন্ন দেশ ডিডলারাইজেশন করছে - আমাদের দেশ করছে, চীন করছে, রাশিয়া করছে। এমতাবস্থায় ইউএস কি মূলত কনজিউমার থাকতে পারবে? অবশ্যই না। তাই ট্রাম্প বলছে, ওদের দেশ থেকে বহিরাগত তাড়াতে হবে। নতুন অভিবাসন নীতি আনতে হবে। অন্য দেশে ফ্যাক্টরি না খুলে নিজের দেশে আনো। ফলে বাইরে থেকে ট্রাম্পের কথাগুলো শুনলে পাগলামি মনে হবে কিন্তু ও পাগল নয়, খুব বুঝে শুনে যা করার ও করছে। ও ঝটিকা যুদ্ধে যাচ্ছে। একটু যাচ্ছে, দুদিন ঝামেলা পাকিয়ে পরের দিন আবার সেনা ফেরত নিয়ে আসছে। টানা যুদ্ধ করতে পারছে না কারণ তাতে ওদের অর্থনীতি ধসে যাবে। 

এআই তৈরি করতে গেলে রেয়ার আর্থ মৌল লাগে। উল্লেখ্য, এ বছরের বাজেটে রেয়ার আর্থ মৌল উত্তোলনের কথা ভারতীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছেন। রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট মানে নিওডাইমিয়াম আর টারবিয়াম, যারা মাইক্রো চিপ প্রসেসর তৈরি করতে কাজে লাগে। এই মাইক্রো চিপ প্রসেসর তৈরিতে বিশ্বের এক নম্বর তাইওয়ান আর দুই নম্বর চীন। রেয়ার আর্থ মৌল মাটি থেকে শুধু তুললেই হল না, তাকে রিফাইন করতে হয়। ভারতে রিফাইনারি নেই কিন্তু ওই সম্পদ বহু রাজ্যের মাটির তলায় রয়েছে। চীন রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট জোগানের জন্যই তাইওয়ান দখল করতে চাইছে।তাইওয়ানের নিকট ইয়োনাগুনি দ্বীপে জাপানের প্রধানমন্ত্রী নৌসেনা পাঠিয়ে রেখেছে। তাই চীন ঝামেলা করে বলছে যে পোস্টড্যাম কনফারেন্সের পর থেকে জাপানের এইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও অধিকারই নেই। একইভাবে ইউএস-এর পক্ষে কেন গ্রিনল্যান্ড দখল করা দরকার? গ্রিনল্যান্ডে তেল আছে, সোনা আছে, রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট আছে। ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের আশেপাশে আর্কটিক সাগরে রাশিয়া তার নৌসেনা দাঁড়িয়ে করিয়ে রেখেছে আর চীন চুপিচুপি গিয়ে গ্রিনল্যান্ডের খনিগুলোতে ইনভেস্ট করে রেখেছে। তাই গ্রিনল্যান্ড হতে চলেছে নিউ মিডিল ইস্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড।

আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের কাছে নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করতে চাইত না। এতে তাদের আধিপত্য নড়ে যাবে। কিন্তু এই সংকটের মুহূর্তে তারা নাচতে নাচতে এসে মোদির সাথে হাত মিলিয়ে বলছে - ফ্রি ট্রেড। ভারতীয়দের জন্য ভিসা রেস্ট্রিকশন কমিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন করছে কারণ তারা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুঙ্কারের ঘটনার পর বুঝে গেছে যে ওদের অবস্থা খারাপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন সেনা ইউরোপেই দাঁড়িয়ে ছিল। ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সেনাকে মার্কিন সেনার সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছিল। তৈরি হয় নেটো - নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন। এমনটা করা হল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য ওদের দেশগুলোতে বিপ্লব হওয়া রুখতে। কিন্তু এর পরিবর্তে ওরা নিজেদের সার্বভৌমত্ব খোয়ালো। সোভিয়েত ইউনিয়নের তো ১৯৯১ সালে পতন হয়ে যায় কিন্তু তারপরও নেটোর কী দরকার ছিল? নেটোকে ব্যবহার করে ইউএস বলল - লুক ইস্ট। রাশিয়ার দিকে একপা একপা করে এগিয়ে তাদের ইউক্রেন আক্রমণ করতে উস্কালো। ইউরোপ ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ালো কিন্তু এই যুদ্ধের বাতাবরণে নিজেদের পায়ের তোলার মাটি নড়ে যেতে দেখছে ইউরোপীয় রাষ্ট্র নেতারা। সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম একটা রিপোর্ট বের করেছে যেখানে তারা সরাসরি বলছে যে সারা বিশ্ব মহাযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। 

এবার আসা যাক চীনের কথায়। ২০০৮-এর সংকটের সময়ে হু জিনতাও বললেন যে লোকের হাতে টাকা নেই তাই সরকারের কফারগুলো খুলে দিতে হবে, সকলের পকেটে টাকা দিয়ে দিতে হবে। তাহলেই অর্থনীতি সচল হবে। কিন্তু ২০১৫-র ক্রাইসিস এলো কারণ শি ঝিনপিং ওদের দেশের সবাইকে বলল শেয়ার বাজারে টাকা লাগাতে - সবাই শেয়ারে টাকা লাগিয়ে দিল আর তারপরেই বাজারে ধস নামল। চীনে এখন তৈরি হয়েছে ঘোস্ট সিটি ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল অবধি চীনের সরকার বলছিল ওদের থেকে জমি কিনতে। চীনে জমি ছিল রাষ্ট্রের অধীনে কারণ সেখানে সরকার সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ করবে ভেবেছিল কিন্তু তারপর তারা জমি বেচতে শুরু করে! একদল প্রোমোটার জমি কিনতে লাগল। এর জন্য তারা ব্যাংক থেকে ধার নিল। এই কেনাবেচার ফলে জমির দাম বাড়তে থাকল। একটা সময়ের পর থেকে দেখা গেল চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি, তারা বাড়িঘরদোর যা কেনার কিনে ফেলেছে আর কিনতে চাইছে না। ফলে যারা টাকা ধার করেছিল, তারা বিল্ডিং বানিয়ে আর বেচতে পারল না। এটাই চাইনিজ হাউজিং ক্রাইসিস। যারা ধার নিয়েছে, তারা এখন আর সরকারকে শোধ করতে পারছে না। তাই ২০২০ সালে শি ঝিনপিং 'থ্রি রেড লাইন' পলিসি আনলেন। তিনটে লাল দাগ কী কী? ডেট টু ইকুইটি, ডেট টু ক্যাশ এবং ডেট টু অ্যাসেটস। এই তিনটে পরিসংখ্যানে যদি লাল দাগের ভ্যালুর তলায় থাকে, তাহলে সরকার আর ধার দেবে না। এর ফলে এভারগ্রান্ডে নামের একটা কোম্পানি দেউলিয়া ঘোষণা হয়ে গেছে। 

এর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে জাপানে কী হচ্ছে? লস্ট ডিকেড-এর সময় থেকে জাপানের অর্থনীতির অবস্থা এতটাই খারাপ যে ওদের সরকার সিদ্ধান্ত নিল ইন্টারেস্ট রেট কমিয়ে রাখার। ইন্টারেস্ট না কমালে কেউ ওখানে ইনভেস্টই করতে চাইছিল না। তাই ওরা সুদের হার প্রচণ্ড কমিয়ে দেয় - প্রায় জিরো পার্সেন্টের কাছাকাছি। এর পরিণতিকে বলা হয় 'ইয়েন ক্যারি ট্রেড'। ধরা যাক একজন অন্য দেশের পুঁজিপতি দেখছে যে জাপানে ইয়েন ধার দিচ্ছে খুব কম সুদে। তাহলে সে জাপানের ইয়েন কিনবে আর ওটাকে ডলারে কনভার্ট করবে ব্যবসা করার জন্য। ডলার সরাসরি ইউএস থেকে কিনতে চাইলে তারা প্রচুর সুদ চাপাবে। ইয়েন মারফৎ ঘুরপথে গিয়ে যেটা হবে, রিটার্ন বা প্রফিট যা আসবে, তার থেকে জাপানকে খুব নগণ্য সুদ দিতে হবে। অর্থাৎ প্রফিটের খুব কম অংশই সুদ মেটাতে ব্যবহৃত হল। কিন্তু ইন্টারেস্ট রেট কম থাকা মানে ইনফ্লেশন হতে পারে। ২০ বছর সময় লেগেছে জাপানে ইনফ্লেশন বেড়ে চিন্তাজনক পরিস্থিতিতে পৌঁছতে। জাপানের প্রাইম মিনিস্টার এবার বলছে, ইন্টারেস্ট রেট বাড়িয়ে ইনফ্লেশন কমাতে হবে। যেই বলা, অমনি যারা ওখান থেকে টাকা ধার করে রেখেছিল তারা তাড়াতাড়ি ফেরত দিতে চাইছে, নইলে বেশি সুদ দিতে হবে। এর ফলে স্টক মার্কেট ক্র্যাশ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

সারা বিশ্বের এখন কি পরিস্থিতি? এসঅ্যান্ডপি ৫০০ নামে একটা শেয়ারের সূচক আছে যেটা দেখায় যে বিশ্বের প্রথম ৫০০টা কোম্পানি কতটা লেনদেন করছে। বিশ্বের যতগুলো কোম্পানি লেনদেন করছে, তাদের মধ্যে যদি খুব অল্প সংখ্যক কোম্পানি অতিরিক্ত বেশি টাকা নিয়ে রাখে, তাহলে কী হবে? ওভারভ্যালুয়েশন। ফানুশ। ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন - অ্যাপেল, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, টেসলা, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট এবং মেটা, টোটাল এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ৪৭% দখল করে রেখেছে। এটাই বোঝাচ্ছে যে এবার একটা ঝামেলা পাকতে চলেছে - বিশ্ব অর্থনীতি রিসেশনের দিকে এগোচ্ছে। 

আমরা যে লং টার্ম ফিক্সড ডিপোজিট ব্যাংকে করে রাখি, তার রিটার্ন বেশি আসে কিন্তু রিসেশনের সময় পরিস্থিতি ঠিক উল্টো হয়ে যায় - লং টার্ম ফিক্সড ডিপোজিটে রিটার্ন কম আসে আর শর্ট টার্ম ফিক্সড ডিপোজিটের রিটার্ন বেশি আসে। একেই বলে ইল্ড কার্ভ ইনভার্সন। বর্তমান পরিস্থিতি এরকমই। 

এবারের অর্থনৈতিক সংকটের ফানুশের উৎস কি? দুটো। 

প্রথম হল এআই। এআই-তে সবাই টাকা লাগাচ্ছে আর ভাবছে যে একদম কালকেই বিরাট কিছু তৈরি হয়ে যাবে। তৈরি অবশ্যই হবে কিন্তু অন্তত ১০-১৫ বছর সময় লাগবে। যে কোনো টেকনোলজি কার্যকর হতেই সময় লাগে, রাতারাতি হয় না। কিন্তু এআই-কে কেন্দ্র করে এত টাকা লাগিয়ে ফেলা হয়েছে যে এবারের ফানুশের একটা উপাদানই এআই। এনভিডিয়া টাকা ঢালছে ওপেন এআই-তে আর ওপেন এআই এনভিডিয়ার থেকে মাইক্রোচিপ কিনছে। তার মানে একই টাকা ঘুরছে গোল গোল ভাবে। ওরাকেল নামের একটা সফটওয়্যার কোম্পানি সময়ের মধ্যে জিনিসপত্র তৈরি করতে না পারায় তার ৭ পার্সেন্ট ভ্যালুয়েশন কমে গেছে। ফলে এআই-তে অতিমাত্রায় লাগানো টাকা রাতারাতি ভালো রিটার্ন দেবে না। এটাই এআই বাবেল। 

দ্বিতীয়ত ​ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে ডলারে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে সোনায় করার প্রবণতা দেখা যায়, ফলে সোনার দাম উঠছে নামছে - এটাই গোল্ড বাবেল। সোনার অবস্থা খারাপ হলে রূপো কেনার প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু রূপো হোক কি সোনা, ডলার একটু শক্তিশালী হলেই এদের দাম পড়তে শুরু করছে।


Source: Investopedia

ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে আমরা এটা বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখছি যে ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। উপরে দেখানো হয়েছে ভারতবর্ষের রিকভারি লকডাউন পরবর্তী সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর ইকোনমিক গ্রোথ হচ্ছে কিন্তু ছোট কোম্পানিগুলোর গ্রোথ হচ্ছে না। এটাকে বলা হয় K-shaped recovery। অর্থাৎ ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি চার চাকার গাড়ির চাহিদা আছে কিন্তু দুই চাকার বাইকের চাহিদা কম। অর্থাৎ গ্রামের লোক সাইকেলও কিনতে পারছে না, এত খারাপ অবস্থা। কিন্তু বড় দামী লাক্সারি কার মার্কেটে রয়েছে কারণ ধনীরা কিনছে। 

এই অর্থনীতি বোঝায় যে সোনা না হলে রূপোতে ইনভেস্ট করো, রূপোতে না হলে এআই-তে যাও, এআই না হলে অন্য একটা কিছু আসবে - অর্থাৎ সে অপশন দিতে দিতে যায়। আসলে সব অপশনই সমস্যাতে গিয়ে ফেলে কারণ এই অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইনপুট আর আউটপুট এক নয়। এখন অবধি নিওলিবেরাল ইকোনমি চললেও নতুন একটা শব্দ আসছে - প্রোটেকশনিজম সব দেশ নিজেকে প্রোটেক্ট করতে চাইছে। প্রোটেকশনিজম-এর দুটো প্রধান চরিত্র - দেশের মধ্যে জনরোষ স্তিমিত করতে উগ্রডানপন্থী সরকারকে নিয়ে আসা আর অন্য দেশের সাথে যুদ্ধ করে নিজের আখের গোছানো। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, চীন আমাদের কাছে কোন অল্টারনেটিভ হতে পারে না। যেদিন ইউএস নেমে যাবে আর চীন উঠে আসবে, ওদের ইউয়ান ডলারের মতই কাজ করার ক্ষমতা রাখবে কারণ মূল অর্থনীতিটা একই। ফলে ইউএস না চীন - এই নিয়ে না ভেবে আমাদের বিকল্প ট্রেডিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যেমন ল্যাটিন আমেরিকাতে ব্রাজিল এবং অন্যান্য দেশগুলো মার্কোসুর ট্রেড ব্লকের মধ্যে সুর নামের কারেন্সি এনেছে যার মাধ্যমে তারা লেনদেন করছে। তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে কেন তা করা যাবে না। অন্তত কিছু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যদি অর্থনৈতিক ঐক্য স্থাপন করা না যায় তাহলে তৃতীয় বিশ্ব একই তিমিরে থেকে যাবে। আমাদের দেশে বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থা খারাপ কিন্তু সব দেশে ব্যাপারটা এমনটা নয়। গ্রিসে নয়। কিছু আফ্রিকান দেশে নয়। ল্যাটিন আমেরিকাতে নয়। আসন্ন সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে অনেক দেশেই বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হবে। এই বিপ্লবের সম্ভাবনাই আমাদের আশাবাদ। হয়তো নতুন কোনো সমাজতান্ত্রিক শিবিরের উদয় হবে। সেই ভয়ে ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সভায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে গাল দিয়েছেন "In 1978, the Czech dissident Václav Havel, later president, wrote an essay called “The Power of the Powerless,” and in it he asked a simple question: how did the communist system sustain itself? And his answer began with a greengrocer. Every morning, the shopkeeper places a sign in his window: “Workers of the world unite.” He doesn’t believe in it. No one does. But he places the sign anyway to avoid trouble, to signal compliance, to get along. And because every shopkeeper on every street does the same, the system persists — not through violence alone, but through the participation of ordinary people in rituals they privately know to be false. Havel called this living within a lie. The system’s power comes not from its truth, but from everyone’s willingness to perform as if it were true. And its fragility comes from the same source. When even one person stops performing, when the greengrocer removes his sign, the illusion begins to crack"। 

এ কথা অনস্বীকার্য যে খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থে একটি বিকল্প বামপন্থী পরিসর দরকার। আমাদের দেশে যদি উগ্রডানপন্থীরাই ক্ষমতায় থাকে, তারা আবার ডিমোনিটাইজেশন-এর মত কিছু একটা করে পুঁজিপতিদের স্বার্থে রক্ষা করবে আর আমাদেরকে যে তিমিরে আছি সেখানেই ফেলে রেখে দেবে। সে আন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ নিয়ে লাফাবে কিন্তু নতুন কোনো ব্যবসা করতে গেলে যে অর্থনৈতিক বাতাবরণ লাগে আন্তর্জাতিকভাবে তা আছে কি? আর যার পারিবারিক সম্পত্তি আগে থেকে রয়েছে, সে-ই বেশি ইনভেস্ট করতে পারে এবং ব্যাপক আর্থিক উন্নতি করতে পারে। তাই বিজেপি পুঁজিবাদী স্বপ্ন দেখালেও আদতে এই ব্যবস্থায় আমাদের অর্থনৈতিক উত্তরণ হবে না। আমাদের উত্তরণ হবে যৌথতায়, খেটে খাওয়ায় এবং তদনুরূপ সরকার প্রতিষ্ঠায়। 

Further readings


Comments

Popular posts from this blog

The Left in Venezuela

The Significance of Marx শীর্ষক আলোচনা সভায় সাথী শংকরের বক্তব্য

আর্য অধিক্রম তত্ত্ব সম্পর্কে স্টাডি নোটস